আমার মায়ের নাম নাজমা আক্তার, পিতাঃমৃত আবদুল গফুর মিয়া, মাতাঃ কুলসুল বেগম। আমার মায়ের জন্ম বরিশাল জেলার মুলাদী থানার গাছুয়া ইউনিয়নের সম্ভ্রান্ত মিয়া পরিবারে।আমার মায়ের শৈশবের কিছু অংশ কাটে খুলনায় নানার রেল বিভাগের চাকরির সুবাদে।মা এখনো আনমনে খুলনায় কাটানো দিনগুলি স্বরন করে।
আমার মায়ের বিয়ে হয় ক্লাস টেনে থাকতে। আমার বাবা তখন সদ্য বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মা তখন গ্রামে থাকতো আর বাবা শহরে। গ্রামে থাকতেই আমার তিন ভাইবোন এর জন্ম হয়। গ্রামে মায়ের কাটানো দিনগুলি ছিলো খুবই পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের। বাবার পাঠানো টাকায় সংসার চালানো দুরহ ছিলো ,যদিও আমার আজন্ম ক্রিয়েটিভ মায়ের জন্য তা বিশেষকিছু ছিলো না। মা গরু, হাস মুরগী পালন ইত্যাদি আর সাথে ক্ষেতের পাওয়া ধান থেকে বাড়তি আয়ের ব্যাবস্থা করে ফেলেছিলেন। এরই মধ্যে মা গ্রামে জমানো টাকা দিয়ে কিছু জমিও কেনে।
ঢাকায় বিমান বাহিনীর কোয়ার্টারে চলে আসলে মায়ের শুরু হয় নতুন জীবন । মা এবার শুধু নিজের সন্তানই নয় নিজের বোন, বোনের ছেলে, দেবর সহ যাকে পারে তাকেই পড়ালেখার ক্ষেত্রে সাহায্য সহযোগীতা করা শুরু করে । আমার যখন ১ বছর তখন বাবা অবসর নিলে আমরা থাকা শুরু করি বিমান বাহিনীর কোয়ার্টার এর পার্শ্ববর্তী মানিকদী এলাকায়। সেই সময় বাবা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো যাতে যা বেতন পাইতো তাতে মোটামুটি স্বাছন্দেই আমাদের জীবন কাটতো । এই সময়টাতেই আমার মা মোটামুটি একটু স্বস্তিতে জীবন কাটিয়েছে।
বাবা চাকরি করার এক পর্যায়ে ব্যাবসা শুরু করলো এবং কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাবসায়ীক পার্টনারদের বেঈমানির ফলে ব্যাপক লোকসানের সম্মূখীন হইলো। তখন প্রায় সবসময়ই বাবার মেজাজ খুব চড়া থাকতো আর বাসায় নিয়মিত কলহ হতো। সেইসময় বাবাকে সাহায্য করার জন্য মা গুলিস্তানস্থ বাবার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে বসা শুরু করে।
মা প্রতিদিন সকালে উঠে আমাদের চার ভাইবোনের জন্য নাস্তা বানিয়ে আমাদের স্কুলে পাঠিয়ে সবার জন্য দুপুরের খাবার তৈরি করে গুলিস্তানের উদ্দেশ্যে বের হতো। সেইসময় আমি ওয়ানে পড়ি। মা প্রতিদিন সকাল আটটায় বের হয়ে রাত আটটায় বাসায় ফিরতো। বাসায় ফিরেই আবার শুরু করে দিতো রাতের খাবার রান্না করা। তখন আমরা ভাই বোন সবাই পড়ালেখা করি। এরিমধ্যে বাবার অফিসে মা সাইড বিজনেস হিসেবে দেশে বিদেশের ফোন করা যায় এমন সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলো। এক পর্যায়ে মা বাউনিয়াতে আমাদের নিজেদের বাড়ির কাজ ধরলো।সদ্য ব্যাবসায় লোকসান খাওয়া বাবার সেই মুহূর্তে বাড়ীর কাজ ধরার মতো অবস্থা ছিলো না মোটেই তারপরও মা শুধুমাত্র বুকের এক বল সাহস নিয়ে খালি হাতেই বাড়ীর কাজ শুরু করে। সেইসময় যে মা কি অবর্ণনীয় কষ্ট করে তা বলার মতো না। তখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে সময় দিয়ে আবার বাড়ীর কাজ তদারকি করতো। এইটুকু চোখ বন্ধ করেই বলা যায় আমাদের বাড়ীর প্রতিটা বালুর কনায় মায়ের ছোয়া লেগে আছে । ১৯৯৬ সালে আমরা নতুন বাড়ীতে উঠি। এই দিকে বাবার থাই এল্যুমিনিয়ামের বিজনেস ধীরে ধীরে শুধু ফোন নির্ভর হয়ে যায় । ফলে মা আমাদের গুলিস্তানস্থ দোকানে সাইড বিজনেস হিসেবে টেইলারস দেয়। সেই সময় মা আর ভাই এই তাজ টেইলারস এর জন্য অনেক পরিশ্রম দেয়। কিছু দিনের ভিতর এই ব্যাবসায় লোকসান গুনলে মা আমার বড় ভাইয়ের সাথে বুদ্ধি করে দোকানে পাঞ্জাবী উঠায়, নাম দেয় তাজ পাঞ্জাবী । এই দোকানের জন্য মায়ের পরিশ্রম বর্ণনাতীত। বিশেষ করে রমজান মাসে তো দিন আর রাত সব দোকানেই হারিয়ে যেতো।
আমার মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে আসে গত বছরের ৩০ই মে তে আমার বাবার চলে যাওয়া। আমার বাবা মায়ের ভিতর প্রচুর কলহ হইতো সত্য কিন্তু আমার মা কোন কাজই বাবার বুদ্ধি ছাড়া করতো না। আর বাবাও মায়ের সকল ধরনের কাজেই সাধ্যমত সাহায্য করতো। তাই বাবার চলে যাওয়াটা মায়ের জন্য ছিলো পুরো একা হয়ে যাওয়া। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত মায়ের পরিশ্রম একটুও কমেনি বরং বেড়েছে। মা সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যেনো বাবার অভাব আমরা কেউ অনুভব না করি।
আজকে মা দিবস অথচ আমার বাবার কথা খুব খুব মনে পরছে। আসলে ছোট বেলা থেকেই একা একা বড় হওয়ার কারনে আমি খুবই কল্পনাপ্রবন এবং আবেগপ্রবন। যদিও আমার এই আবেগ প্রবনতায় লাগাম দিতে আমি সিদ্ধহস্ত। জীবনের যে কোন ঘটনাতেই আমি আবেগের রাশ টেনে ধরতে পারি যা কেউ টের পায় না। আমার বাবা যেইদিন মারা গিয়েছিলো সেইদিনও আমি ছিলাম খুবই স্বাভাবিক। আমি বুঝতে পারতেছিলাম বাবার চলে যাওয়া আমার জন্য দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট। আজও ছোট খাটো যেকোন ঘটনায় আমার বাবার কথা মনে পরে । বাবা চলে যাওয়ার পরই ভালো করে উপলব্ধি করতে পারছি মা আমার কাছে কি...
আমার জীবনের পুরোটাই এখন শুধুমাত্র আমার মা আর আমার মাতৃভূমির জন্য।
আল্লাহ্ যেনো আমার মাকে দীর্ঘজীবী করেন।
No comments:
Post a Comment